loader image
শিরোনাম

খেলাপি গ্রাহকদের প্রণোদনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ছাড়ে ব্যাংকিং খাতের ক্ষত আরও গভীর

ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের পুনর্নিয়োগে কঠোর মূল্যায়ন; খেলাপি ঋণ কমানো, সুশাসন ও সম্পদের মান উন্নয়নে নতুন কাঠামো

নিজস্ব প্রতিবেদক

খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধে কঠোর করার পরিবর্তে বিভিন্ন সময়ে পুনঃতফসিল, পুনর্গঠনসহ নানা ধরনের নীতিগত ছাড় দেওয়ার ফলে ব্যাংকিং খাতে ঋণশৃঙ্খলা আরও দুর্বল হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব সুবিধার কারণে সময়মতো ঋণ পরিশোধের পরিবর্তে অনেক ঋণগ্রহীতার মধ্যে ভবিষ্যতে নতুন কোনো সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এতে নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারীরা একদিকে নিরুৎসাহিত হয়েছেন, অন্যদিকে খেলাপি হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। ফলে ব্যাংকের ঋণসম্পদের মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি খেলাপি ঋণের প্রকৃত ঝুঁকি আড়াল হয়েছে। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের কর্মসম্পাদন মূল্যায়নে খেলাপি ঋণ কমানো ও ঋণ আদায়কে সরাসরি যুক্ত করায় অতীতের এসব ছাড়ের প্রভাবও নতুন করে সামনে আসছে।

ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব ও কর্মসম্পাদন মূল্যায়নে নতুন কাঠামো চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনকালে ব্যাংকের মূল আর্থিক ও পরিচালনগত সূচকে কী ধরনের অগ্রগতি করেছেন, তা নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে পরিমাপ করা হবে। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ কমানো, খেলাপি ও অবলোপন করা ঋণ আদায়, মূলধন শক্তিশালী রাখা, তারল্য পরিস্থিতি, সুশাসন, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, গ্রাহকসেবা ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মতো বিষয়কে মূল্যায়নের আওতায় আনা হয়েছে। ফলে এতদিনের তুলনায় শীর্ষ নির্বাহীদের পুনর্নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও জবাবদিহিমূলক ও ফলাফলনির্ভর হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা নতুন কাঠামোয় বলা হয়েছে, ব্যাংকের সুশাসন, আমানতকারীর স্বার্থ সংরক্ষণ, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীর কর্মসম্পাদন মূল্যায়নে অভিন্ন কাঠামো প্রয়োজন। এর আগে ২০২৪ সালের নির্দেশনায় নিয়োগ বা পুনর্নিয়োগের সময় খেলাপি ঋণ কমানো এবং অবলোপন করা ঋণ আদায়ের নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণের কথা বলা হয়েছিল। একই সঙ্গে আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত উন্নয়নের লক্ষ্যও নিয়োগ চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশনা ছিল। নতুন কাঠামো সেই ব্যবস্থাকে আরও পরিমাপযোগ্য করেছে।

নতুন ব্যবস্থায় ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কর্মসম্পাদন পাঁচটি প্রধান ক্ষেত্রে পরিমাপ করা হবে। এর মধ্যে ব্যাংকের মূলধন ও তারল্য পরিস্থিতির জন্য ২৫ শতাংশ, সম্পদের মানের জন্য ২৫ শতাংশ, মুনাফার জন্য ১০ শতাংশ, সুশাসন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের জন্য ২৫ শতাংশ এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, গ্রাহকসেবা ও বাজার আচরণের জন্য ১৫ শতাংশ ওজন নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ মোট মূল্যায়নের অর্ধেকই নির্ভর করবে ব্যাংকের মূলধন, তারল্য ও ঋণসম্পদের মানের ওপর।

এই কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মূল্যায়ন এখন শুধু মুনাফা কত হয়েছে তার ওপর নির্ভর করবে না। বরং ব্যাংকের মূলধন ঝুঁকির বিপরীতে পর্যাপ্ত কি না, আমানতের তুলনায় ঋণ বিতরণের মাত্রা নিয়ন্ত্রিত কি না, ব্যাংকের তারল্য সক্ষমতা কেমন, খেলাপি ঋণের অনুপাত কমছে কি না, বড় ঋণগ্রহীতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমছে কি না এবং খেলাপি ও অবলোপন করা ঋণ থেকে আদায় বাড়ছে কি না—এসব বিষয় সরাসরি মূল্যায়নে আসবে।

বিশেষ করে সম্পদের মানসংক্রান্ত মূল্যায়নে খেলাপি ঋণের মোট অনুপাত ও নিট অনুপাত, পুনর্গঠিত ও পুনঃতফসিল করা ঋণসহ ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ, সংরক্ষণ ঘাটতি আছে কি না, বড় ঋণ ও শীর্ষ ঋণগ্রহীতাদের ওপর ঋণের কেন্দ্রীভবন এবং খেলাপি ও অবলোপন করা ঋণ আদায়ের অগ্রগতি বিবেচনায় নেওয়া হবে। খেলাপি ঋণের অনুপাত কমার প্রবণতা এবং আদায়ের পরিমাণ বাড়ার প্রবণতাকে প্রত্যাশিত ফলাফল হিসেবে ধরা হয়েছে।

এখানেই নতুন কাঠামোর তাৎপর্য সবচেয়ে বেশি। কারণ কোনো ব্যাংক কেবল কাগজে-কলমে মুনাফা দেখিয়ে তার শীর্ষ নির্বাহীর কর্মসম্পাদনকে সন্তোষজনক হিসেবে উপস্থাপন করতে পারবে না। একই সময়ে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকলে, বড় ঋণগ্রহীতাদের ওপর ঝুঁকি কেন্দ্রীভূত হলে অথবা খেলাপি ও অবলোপন করা ঋণ আদায়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হলে তার প্রভাব ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মূল্যায়নে পড়বে। ছয়টি নির্দিষ্ট সূচকের কোনো একটিতে নির্ধারিত লক্ষ্যের ৫০ শতাংশের কম অর্জন হলে সংশ্লিষ্ট সূচকে কোনো নম্বর পাওয়া যাবে না। এসব সূচকের মধ্যে রয়েছে আমানতের বিপরীতে ঋণের অনুপাত, মোট খেলাপি ঋণের অনুপাত, নিট খেলাপি ঋণের অনুপাত, বড় ঋণ ও শীর্ষ ঋণগ্রহীতার কেন্দ্রীভবন, খেলাপি ও অবলোপন করা ঋণ আদায় এবং ক্ষুদ্র, কৃষি, পরিবেশবান্ধব অর্থায়ন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রসার।

শুধু তাই নয়, এসব গুরুত্বপূর্ণ সূচকে নির্ধারিত লক্ষ্যের ৫০ শতাংশের কম অর্জন বা শূন্য নম্বর হলে মোট প্রাপ্ত নম্বর থেকেও অতিরিক্ত নম্বর কেটে নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। ফলে কোনো একটি ক্ষেত্রে দুর্বলতা থাকলেও তা অন্য কোনো সূচকে ভালো ফল করে পুরোপুরি পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ সীমিত হবে। অর্থাৎ ব্যাংকের সার্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে শীর্ষ নির্বাহীর কর্মসম্পাদনকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা হয়েছে।

মোট নম্বরের ভিত্তিতে ৭৫ বা তার বেশি হলে কর্মসম্পাদনকে গড়ের চেয়ে বেশি, ৬৫ থেকে ৭৫-এর কম হলে গড় এবং ৬৫-এর নিচে হলে গড়ের নিচে হিসেবে বিবেচনা করা হবে। গড় পর্যায়ের কর্মসম্পাদনেও উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে বলে নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে এবং গড়ের নিচের কর্মসম্পাদনকে তাৎক্ষণিক উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে এমন কর্মসম্পাদন হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

পুনর্নিয়োগের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্বের মেয়াদ শেষে কোনো ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহীকে পুনর্নিয়োগের আগে পরিচালনা পর্ষদকে তার পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের অগ্রগতি নিয়ে মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে। সেই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংক দায়িত্ব পালনকালে সময়ে সময়ে যেসব দায়িত্ব ও লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, সেগুলোর বাস্তবায়নও বিবেচনা করতে হবে। পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদিত মূল্যায়ন প্রতিবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে। ফলে পুনর্নিয়োগ এখন শুধু পরিচালনা পর্ষদের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের বিষয় না থেকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল্যায়নের সঙ্গেও যুক্ত হলো।

নতুন ব্যবস্থায় লক্ষ্য নির্ধারণের ক্ষমতা প্রথমে পরিচালনা পর্ষদের হাতে থাকলেও সেটি পুরোপুরি স্বাধীন নয়। আগের প্রান্তিকের তথ্যকে ভিত্তি ধরে পরবর্তী লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংকের ঝুঁকির ধরন, ব্যবসায়িক কৌশল, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রত্যাশা এবং আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা বিবেচনা করতে হবে। নির্ধারিত লক্ষ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পাঠানোর পর বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন বা পরিবর্তন করে অনুমোদন দিতে পারবে।

বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের জন্য প্রথম মূল্যায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত। সাধারণভাবে ছয় মাস অন্তর কর্মসম্পাদন পর্যালোচনা করা হবে। নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ হলেও তার প্রথম মূল্যায়নকাল সংশ্লিষ্ট প্রান্তিকের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারণ করা হবে। অর্থাৎ দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তার কর্মসম্পাদনের পরিমাপযোগ্য হিসাব শুরু হয়ে যাবে।

তবে নতুন এই কাঠামো কার্যকর হওয়ার পেছনে ব্যাংক খাতের সাম্প্রতিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ, ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন, অবলোপন এবং বিভিন্ন ধরনের নীতিগত সুবিধা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ঋণগ্রহীতাদের একটি অংশ ব্যবসায়িক সমস্যার কারণে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলেও আরেকটি অংশ নিয়মিতভাবে নীতিগত সুবিধার প্রত্যাশায় ঋণ পরিশোধে অনীহা দেখানোর সুযোগ পেয়েছে, এমন অভিযোগ ব্যাংকারদের মধ্যে রয়েছে। ফলে নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী এবং ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করা ঋণগ্রহীতার মধ্যে পার্থক্য দুর্বল হয়ে পড়লে ঋণশৃঙ্খলার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ব্যাংকারদের একটি অংশের মধ্যে এ নিয়ে চাপা অসন্তোষও রয়েছে। তাদের যুক্তি, অতীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন নির্দেশনা ও বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধের সময় বাড়ানো, পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের সুযোগ এবং অন্যান্য ছাড় দেওয়ার প্রবণতা ছিল। ফলে ব্যাংকের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা অনেক সময় ঋণ আদায় ও শ্রেণিকরণের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নিতে গিয়ে নীতিগত বাস্তবতার সঙ্গে দ্বন্দ্বে পড়েছেন। এখন একদিকে পুরোনো সুবিধার প্রভাব রয়ে গেছে, অন্যদিকে নতুন মূল্যায়ন ব্যবস্থায় শীর্ষ নির্বাহীদের কাছ থেকে খেলাপি ঋণ কমানো ও আদায় বাড়ানোর ফলাফল চাওয়া হচ্ছে। এই পরিবর্তনকে কেউ কেউ হঠাৎ করে দায়িত্বের চাপ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখছেন।

এর সঙ্গে আরও একটি বড় প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। দীর্ঘদিন ধরে কোনো ঋণগ্রহীতা যদি নিয়মিতভাবে জানতে পারেন যে ঋণ পরিশোধ না করলেও পরবর্তী সময়ে পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন বা অন্য কোনো সুবিধার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে, তাহলে ঋণ পরিশোধের প্রণোদনা দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এতে ভালো ব্যবসা করেও সময়মতো ব্যাংকের দায় পরিশোধ করার পরিবর্তে সুবিধা পাওয়ার অপেক্ষায় থাকার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এমন আচরণ ব্যাপক হলে তা কেবল একটি ব্যাংকের সমস্যা থাকে না; পুরো ঋণবাজারের ঋণশৃঙ্খলার ওপর প্রভাব পড়ে।

বিশেষ করে ঋণখেলাপিকে বারবার বিভিন্ন নামে সুবিধা দেওয়ার সংস্কৃতি যদি চলতে থাকে, তাহলে নিয়মিত ঋণগ্রহীতারাও ভবিষ্যতে একই ধরনের সুবিধার প্রত্যাশা করতে পারেন। এতে ঋণ পরিশোধের নৈতিক ও আর্থিক প্রণোদনা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একপর্যায়ে ভালোভাবে ব্যবসা পরিচালনা করে নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী গ্রাহক এবং কৌশলে সুবিধা নেওয়া গ্রাহকের মধ্যে আচরণগত পার্থক্য কমে যেতে পারে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ব্যাংকের ঋণসম্পদের মানে পড়তে পারে।

নতুন মূল্যায়ন কাঠামো এই জায়গাতেই একটি ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। এখন ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর জন্য শুধু ঋণ বিতরণ বাড়ানো বা মুনাফা অর্জন যথেষ্ট হবে না; ঋণের মান, আদায়, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং সুশাসনও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এমনকি মুনাফার জন্য নির্ধারিত ওজন যেখানে ১০ শতাংশ, সেখানে সুশাসন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের ওজন ২৫ শতাংশ এবং সম্পদের মানের ওজনও ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ স্বল্পমেয়াদি মুনাফার চেয়ে ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও ঋণসম্পদের মানকে কাঠামোটিতে তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

শুধু খেলাপি ঋণ নয়, পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার সুশাসনও এবার সরাসরি মূল্যায়নের আওতায় এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন ও অভ্যন্তরীণ ও বহিঃনিরীক্ষায় গুরুতর অনিয়ম অনিষ্পন্ন থাকা, উচ্চ ঝুঁকির পর্যবেক্ষণ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার আরোপিত জরিমানা, অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে ব্যাংকের অবস্থান, সামগ্রিক ঝুঁকি মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রক প্রতিবেদন যথাসময়ে ও নির্ভুলভাবে দাখিল এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রযুক্তিগত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও বিবেচনায় নেওয়া হবে।

গ্রাহকসেবার ক্ষেত্রেও নতুন কাঠামোটি বিস্তৃত। ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেনের প্রসার, গ্রাহকের অভিযোগ নিষ্পত্তি, নতুন পণ্য ও প্রক্রিয়া চালু, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, কৃষি ও পরিবেশবান্ধব অর্থায়ন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, গ্রামীণ এলাকায় ঋণ বিতরণ, জালিয়াতি ও প্রতারণা প্রতিরোধ এবং ব্যাংকের বিরুদ্ধে চলমান মামলার অর্থমূল্য কমানো ও মামলা নিষ্পত্তি থেকে আদায় বাড়ানোর বিষয়ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মূল্যায়নে যুক্ত হয়েছে।

ফলে নতুন কাঠামোকে শুধু পুনর্নিয়োগের পরীক্ষা হিসেবে দেখলে এর ব্যাপ্তি কম করে দেখা হবে। এটি মূলত ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বকে পরিমাপযোগ্য ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত করার একটি নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা। বিশেষ করে যে সময়ে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, দুর্বল ঋণ আদায় এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, সে সময়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কর্মসম্পাদনকে এসব বিষয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার ফলে ব্যাংক পরিচালনায় নতুন ধরনের জবাবদিহিতা তৈরি হতে পারে।

তবে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে লক্ষ্য নির্ধারণ ও মূল্যায়ন কতটা বাস্তবভিত্তিক, নিরপেক্ষ ও ধারাবাহিকভাবে করা হচ্ছে তার ওপর। কারণ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বা মুনাফার পরিবর্তনের পেছনে শুধু ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সিদ্ধান্তই কাজ করে না; অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, শিল্পখাতের অবস্থা, ঋণগ্রহীতার ব্যবসায়িক সক্ষমতা, আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং নিয়ন্ত্রক নীতির পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই মূল্যায়নে শুধু ফলাফল নয়, সেই ফলাফলের পেছনের বাস্তব কারণও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

অন্যদিকে, অতীতের বিভিন্ন ছাড় ও পুনঃতফসিল সুবিধার কারণে যেসব ঋণগ্রহীতার ঋণ পরিশোধের আচরণ দুর্বল হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে কঠোর ঋণশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ছাড়া শুধু ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ওপর দায় চাপিয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা কঠিন হতে পারে। নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী গ্রাহককে পুরস্কৃত করা, ইচ্ছাকৃত খেলাপিকে যথাযথভাবে চিহ্নিত করা এবং প্রকৃত ব্যবসায়িক সংকটে পড়া গ্রাহককে স্বচ্ছ ও নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সার্বিকভাবে নতুন মূল্যায়ন কাঠামো ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের দায়িত্বের পরিধিকে আগের তুলনায় আরও স্পষ্ট করেছে। পুনর্নিয়োগের সময় শুধু পরিচালনা পর্ষদের আস্থা নয়, নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের পরিমাপযোগ্য ফলাফলও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ কমানো, ঋণ আদায় বাড়ানো, বড় ঋণগ্রহীতার ঝুঁকি কমানো, মূলধন ও তারল্য শক্তিশালী রাখা এবং সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দুর্বলতা থাকলে তার প্রতিফলন কর্মসম্পাদন মূল্যায়নে পড়বে। ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ঋণ পরিশোধে শিথিলতা ও নানা সুবিধানির্ভর সংস্কৃতির বিপরীতে এটি যদি ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করা যায়, তাহলে ব্যবস্থাপনার জবাবদিহিতার পাশাপাশি ঋণগ্রহীতাদের আচরণেও পরিবর্তনের চাপ তৈরি হতে পারে। শেষ পর্যন্ত এর সফলতা নির্ভর করবে নিয়মের প্রয়োগে ধারাবাহিকতা, নীতিগত স্থিরতা এবং ভালো ও খারাপ ঋণগ্রহীতার মধ্যে ন্যায্য পার্থক্য বজায় রাখার ওপর।

Please follow and like us:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top