নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, দুর্নীতি ও অর্থপাচার থেকে রাষ্ট্রকে পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, ফিলিস্তিন, অভিবাসন এবং প্রযুক্তিগত বৈষম্যসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন। বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে দেওয়া প্রায় ১৭ মিনিটের ভাষণে তিনি বাংলাদেশকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে সরকারের রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন—থ্রি-আর কৌশলের কথা জানান।
ভাষণের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। স্বাধীনতার পর গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা জীবন দিয়েছেন, তাঁদের অবদানের কথাও স্মরণ করেন তিনি। পাশাপাশি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের শাসন ও শোষণের পর বাংলাদেশ ২০২৪ সালে একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। তাঁর ভাষায়, গুম, খুন, অপহরণ, দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থপাচারের মতো সমস্যার প্রভাব থেকে দেশকে বের করে এনে আবার গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে নিতে সরকার কাজ করছে। ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশকে মেরামত ও পুনর্গঠনের জন্যই সরকার Recovery, Restoration এবং Reconstruction বা থ্রি-আর কৌশল গ্রহণ করেছে।
এই কৌশলের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে পুনরুদ্ধার, প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পুনঃস্থাপন এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য নতুন কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। অর্থপাচার ও লুটপাটের কারণে রাষ্ট্রের যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের বৃহত্তর পরিকল্পনার সঙ্গে এই কৌশলকে যুক্ত করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সামনে এখন সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। দেশের বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করে জনমিতিক সুবিধাকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শক্তিতে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে একটি উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য চলতি অর্থবছরে ৫ কোটি মার্কিন ডলার বরাদ্দের কথাও ভাষণে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। স্টার্টআপ উদ্যোগের মাধ্যমে তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি গবেষণা ও উদ্ভাবনকে অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
নারীর ক্ষমতায়নকেও সরকারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ সম্প্রসারণের কথা জানান তিনি। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে নারী উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে সহায়তা দেওয়ার কথা বলেন তিনি। ফ্যামিলি কার্ডকে পরিবারের নারী প্রধানের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করে বিভিন্ন খাতে দেওয়া সহায়তা সমন্বিত করে ভবিষ্যতে ইউনিভার্সাল কার্ড চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান।
শিক্ষা খাতেও সরকারের বড় পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী পাঁচ বছরে ধীরে ধীরে শিক্ষা খাতে মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ শতাংশ ব্যয় করার লক্ষ্যের কথা জানান তিনি। কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও বলেন।
প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের স্কুলব্যাগ, পোশাক ও বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দেওয়ার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো শিক্ষাক্রমে খেলাধুলাকে একটি বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কথা জানান। এর মাধ্যমে খেলাধুলাকে ভবিষ্যতে পেশা হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরির লক্ষ্য রয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অন্যতম বড় ইস্যু রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও জোরালো বক্তব্য দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, নয় বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এতে দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ মিয়ানমারে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর স্থায়ী সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনকে সংকট সমাধানের একমাত্র পথ হিসেবে তুলে ধরে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা চান তিনি। প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জন্য জীবন রক্ষাকারী মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
ফিলিস্তিন ইস্যুতেও বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের অবিচল সমর্থনের কথা জানান তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান খুবই কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের দিক থেকে বাংলাদেশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
পরিবেশ রক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচির কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। বন্যা ও খরা মোকাবিলায় সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের উদ্যোগের কথা বলেন। তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ ও সুন্দরবনে মিঠাপানির প্রবাহ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের বিষয়টিও তাঁর ভাষণে গুরুত্ব পায়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানের ডিজিটাল বৈষম্য যেন ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈষম্যে পরিণত না হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রসঙ্গেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। উত্তরণের পর অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য চাপ মোকাবিলায় নিশ্চিত অর্থায়ন, বাজারে প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান যুদ্ধ ও সংঘাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে বাস্তুচ্যুতি, মানবিক সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তার সমস্যা ও মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। এসব সংকট সমাধানে সংলাপ, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদানের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘকে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
অভিবাসন ইস্যুতে নিরাপদ, নিয়মিত ও সুশৃঙ্খল অভিবাসন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতির কথা জানান তিনি। অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
সবশেষে প্রধানমন্ত্রী এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, যেখানে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত হবে। রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্ম বা জাতিগত পরিচয় নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা, সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার কথা বলেন তিনি।
ভাষণের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী তরুণদের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ, নারীদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে চলার সুযোগ এবং প্রতিটি শিশুর পূর্ণ সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ তৈরির প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তাঁর ভাষণের মূল বার্তায় উঠে আসে—“বাংলাদেশ ফার্স্ট: বাংলাদেশ ফর অল”—অর্থাৎ বাংলাদেশের অগ্রাধিকার হবে বাংলাদেশ এবং সেই বাংলাদেশ হবে সবার জন্য।
